মধ্যরাতে হাঁটতে হাঁটতে যে পথ উঠে গেল রঙিন আসমানে সে আমার শহরের পথ, যেখানে জলপরী মাগুরমাছের মতো কিলবিল করে, কাতরায় সে আমার শীতলক্ষ্যা নদী, যে কেবলি বহমান ইবনে বতুতার বজরায় চড়ে কালের সীমানা ভেঙে ভেঙে – বেহুলার ভাসান যেদিন এই পথে বাতাশা-প্রদীপ ভরে খোয়াজখিজিরের ভেলায় গেল চলে সে তবে সুদূর অতীত ডকইয়ার্ড, আদমজী আর পাটের গুদামে গুদামে যার ধ্বংস লেগে আছে।
নক্ষত্র পতনের মতো বুকের গভীর ছুঁয়ে ঝড়ে পরে রক্তজবা অবিরাম, সাপের ফনার মতো ঢেউয়ে ঢেউয়ে গর্জেওঠে শীতলক্ষ্যার পানি, ডাইং এর বিষাক্ত বর্জ আর লাশের রাসায়নিক সফেদ কাফন হয়ে -আঁকড়ে ধরে চৈতন্যের আতরে মাখা কদমরসুল – লাসেরা ভাসতে থাকে, ভাসে মরা মাছ হয়ে পরিত্যাক্ত নগর সভ্যতার।
আদমবৃক্ষের খোঁজে ডাল-পালা ছেয়ে যায় লেম্পপোষ্ট, শহরের পথ; শিকড়-বাকড় যত ঠিকানা খুঁজতে খুঁজতে বয়ে চলে মাটির গভীরে থাকা তিতাস আর ওয়াসার মরচেমাখা পাইপলাইন ধরে – যেতে যেতে মিশে যায় ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানীতে আটকে পড়া দুশ বছরের কারেন্টেরজাল।
এ আমার শহর, নিরীহ, নিঃসঙ্গ, নিস্তব্ধ-কোলাহল সাতপুরুষের বেড়ে ওঠা নুহের নৌকা। গোলাপ ফুটেছে ঢের নির্ভয়ে কতোনা এখানে রক্তপাতহীন বাগানে, বৃক্ষে কতো নন্দন-প্রজাপতি প্রণয়ে আহ্বানে – এইসব পথ-ঘাট, অলি-গলি, গঞ্জ-বাজার বড় পুরাতন মন্দির আর ইশ্কুলের ঘন্টার মতো, কারখানার, রেলের হুইসেলের মতো বড় চেনা বুকের পকেটে রাখা সবুজ ঠিকানা।
তবুও পেন্ডোরার বাক্স ফুড়ে বেরিয়ে আসে সময়ের দুর্বিনীত ভাঁজ, শ্বাপদের বিষাক্ত নিঃশ্বাস, নেমে আসে নিস্তব্ধতা কবরের অরণ্য গভীরে যেতে যেতে কুলাঙ্গারের কণ্ঠস্বর ওঠে ভেসে বিদ্যুৎপৃষ্ট গোলাপ যন্ত্রণায় নীল হয়ে যায় –
নীল-দংসনে ক্ষত-বিক্ষত হয় আল্লামা ইকবাল রোডের দেওয়ান মঞ্জীল, টর্চারসেল থেকে দমকলের মতো বেরিয়ে আসে রক্তের স্রোত, ভেসে যায় আঙিনা, দেয়াল, হাসপাতাল, করিডোর, পথ-ঘাট, জনপদ তাবৎ শহর –
রক্তের ভেতর থেকে জেগে ওঠে বেহিসেবি জোছনার ঢেউ, চাষাড়ার গোল-চত্বর, শহিদমিনার থেকে জেগে ওঠে একগুচ্ছ মুষ্টিবদ্ধ হাত, বেড়িয়ে আসে ছড়িয়ে পড়ে চারদিক খুনী জল্লাদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে চোখ, মুখ, বুক, ইউনিফর্ম পড়া ইশকুলের শিশু, রিক্সাওয়ালা, মাঝি, মুয়াজ্জীন, কসাই, মেথর, বেশ্যা আর আবালবৃদ্ধবনিতা গর্জেওঠে ধিক্কারে, অভিসম্পাতে; থুথু দেয় ভিখিরির ঐ উলঙ্গ শিশু।
শহরের এই সব দৃশ্যপট, নিত্যকার জীবনযাপন যাপিত জীবনের পিঠে চড়ে বসা সার্কাসের বিষন্ন সহিস ছুটে চলে অবিরাম –
তবু কোন ইতিহাস, দিবা রাত্রি মহাকাল মানচিত্রের অসম সীমানায় জেগে থাকে, জেগে রয় হলুদ ঘাসের উপর মাথা রেখে বিস্ফারিত চেখে, জেগে থাকে বিপন্ন সময় আর অসীম যন্ত্রণায় স্বপ্ন আগলে রাখা এক গর্ভবতী নারী; গোকুলে নয় আমার শহরের কালের জননী।