অর্থনীতির কঠিন সন্ধিক্ষণ: বিনিয়োগ স্থবির, দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী—কঠিন পরীক্ষায় আমীর খসরু
মোঃ শহিদুল ইসলাম
বিশেষ সংবাদদাতা:
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগে ভাটা, কর্মসংস্থানের সংকোচন, দারিদ্র্যের ঊর্ধ্বগতি এবং লাগামছাড়া দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চাপ, তারল্য সংকট এবং পুঁজিবাজারে দীর্ঘস্থায়ী আস্থাহীনতা অর্থনীতির ভিতকে নড়বড়ে করে তুলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমপি—যা তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “মানুষের প্রত্যাশা অনেক। সেই প্রত্যাশা পূরণ করাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ধাপে ধাপে সমস্যাগুলোর সমাধান করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ধারায় ফিরিয়ে আনতে চাই।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই সরকার এগোবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ কমেছে, অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে, বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের চাপ বেড়েছে।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং তারল্য ঘাটতি অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আর্থিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, তদারকি জোরদার এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন অত্যন্ত জরুরি। উল্লেখ্য, নতুন অর্থমন্ত্রী একসময় চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ–এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
বাজার কাঠামো ও করপোরেট গভর্ন্যান্স বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা পুঁজিবাজার পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বাজার তদারকি বাড়ানো ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে—এমন মত অর্থনীতিবিদদের।
নতুন অর্থমন্ত্রী ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রথম ধাপে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা, দ্বিতীয় ধাপে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার এবং তৃতীয় ধাপে টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি মজবুত করার রূপরেখা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ আমীর খসরু ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম-৮ আসনে উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বেসরকারি খাত সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জোরদারে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
তবে অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় দ্রুত ফল দেখানো সহজ হবে না। বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সঠিক নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই স্থবিরতা কাটিয়ে প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরা সম্ভব—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
দেশের অর্থনীতি এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে। এই মুহূর্তে নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের গতি—আর সেই পরীক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নতুন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।